খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল

ইজারায় চালু ৪ পাটকল বড় পরিসরে উৎপাদনে যেতে পারেনি তিনটি

খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলের মধ্যে চারটি ইজারায় চালু হলেও বড় পরিসরে উৎপাদনে যেতে পারেনি তিনটি।

খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলের মধ্যে চারটি ইজারায় চালু হলেও বড় পরিসরে উৎপাদনে যেতে পারেনি তিনটি। বাকি পাঁচটি পাটকলের চারটি বেসরকারিভাবে চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও মিলছে না প্রত্যাশিত বিনিয়োগকারী। এছাড়া অন্যটির মালিকানা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। এ অবস্থায় ইজারাবিহীন কারখানাগুলো কবে চালু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনার আঞ্চলিক সমন্বয় কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘লিজ প্রক্রিয়ায় আমরা চারটি পাটকল চালু করেছি। এর মধ্যে যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (জেজেআই) পুরোদমে উৎপাদন শুরু করেছে। অন্য তিনটি খুব বেশি উৎপাদনে যেতে না পারলেও কারখানাগুলোকে উৎপাদনমুখী রেখেছে। এছাড়া বাকি পাঁচটি পাটকল চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সবগুলো পাটকল চালু করা যাবে।’

তবে অভিযোগ উঠেছে, ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কারো কারো পাটজাত পণ্য উৎপাদনের অভিজ্ঞতাই নেই। ইজারা নেয়ার পর কারখানা থেকে গাছ কর্তন, যন্ত্রপাতি বিক্রি, তৃতীয় পক্ষকে ইজারা দেয়া, এমনকি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লোন নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সেই টাকা দিয়ে তাদের নিজস্ব জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাটকলের কথা বলে ইজারা নেয়া হলেও সেখানে অন্য কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে।

পাটকলসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইজারায় চালু চারটি পাটকলে আগে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬ টন। বর্তমানে সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ১৮ টনের মতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়ক গোলাম রাব্বানী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় খুলনা অঞ্চলের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছিল পাটনির্ভর অর্থনীতি। আশির দশকেও এসব পাটকল ঘিরে ছিল হাজারো মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু এরপর থেকে একের পর এক পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাটের সেই গৌরব অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান কমে গেছে, অন্যদিকে ভাটা পড়েছে পাটকল এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে।

বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় ও পাটকল শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ জুলাই লোকসান ও উৎপাদন খরচের কারণ দেখিয়ে খুলনা অঞ্চলের নয়টিসহ ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। এতে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক চাকরি হারান।

এরপর বিজেএমসি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বন্ধ পাটকল চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা পিপিপির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দাবি করেন। পরে পাটকল চালুর পথ খুঁজতে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি স্বল্প সময়ের জন্য পাটকলগুলো ইজারা দিতে সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে ১৫-২০ বছর মেয়াদে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে শর্ত ছিল ইজারাদার শুধু পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারবে। আর মেয়াদ হবে ২০ বছর। কিন্তু তাতে কেউ তেমন আগ্রহ দেখায়নি। পরবর্তী সময়ে পাটজাত পণ্যের বাইরে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। পাশাপাশি পাটকলগুলোকে বেসরকারি খাতে ৩০ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দৌলতপুর জুট মিলটি ফরচুন গ্রুপের কাছে ইজারা দেয়া হয়। গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি এখানে স্বল্প পরিসরে জুতা তৈরির কারখানা চালু করেছে।

খুলনা নগরের খালিশপুরে অবস্থিত দৌলতপুর জুট মিলে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক পাটের বস্তা তৈরি করছেন। আরেকটি অংশে জুতা তৈরি হচ্ছে। কারখানায় ৬০০ জনের মতো শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে ১৮০ জন পাটের কাজ ও অন্যরা জুতা উৎপাদনে কাজ করছেন।

পাটকলটির প্রকল্প প্রধান তানজিলা মাহমুদা বণিক বার্তাকে জানান, কারখানাটিতে ২৫০টি তাঁত থাকলেও বর্তমানে চালু করা হয়েছে ৩০টি। কারখানা বন্ধের আগে এখানে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করতেন, বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৬০০ শ্রমিক। বন্ধের আগে উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ টন, তবে এখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র দেড় টন।

উৎপাদন কমের বিষয়ে ফরচুন গ্রুপের আইনি পরামর্শক মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘প্রথমত পাটের অনেক দাম। তাছাড়া পাটকল শ্রমিকরা বেশির ভাগই খুলনা ছেড়েছেন। তরুণ শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা কাজ করছেন, তাদের বেশির ভাগই বয়স্ক।’ একই সঙ্গে তারা জুতার উপকরণে পাটপণ্য ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

খুলনা অঞ্চলের বাকি পাটকলগুলোর মধ্যে খালিশপুর জুট মিল ইজারা নিতে শর্তানুযায়ী অগ্রিম টাকা জমা দিয়েছে রেডিয়েন্ট গ্রুপ; কিন্তু এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। ক্রিসেন্ট জুট মিল ইজারা নিতে ঢাকা শকস নামের একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে তারা কিছুটা সময় চেয়েছে। অন্যদিকে আলিম জুট মিলের মালিকানা নিয়ে মামলা থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। খুলনার স্টার ও প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ইজারা দিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বিজেএমসি।

গত বছরের নভেম্বরে যশোরের রাজঘাট এলাকার জেজেআই জুট মিলের ইজারা পায় আকিজ গ্রুপ। জানা গেছে, কারখানাটি আধুনিক করতে তারা বিনিয়োগ করেছে। পাটকলটির প্রকল্প প্রধান আবুল কালাম বলেন, ‘পুরনো মেশিন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। শর্তের মধ্য থেকে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে নতুন মেশিন বসানো হচ্ছে। এছাড়া পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।’ এ পাটকল থেকে বর্তমানে প্রায় ছয় টনের মতো পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ইস্টার্ন ও কার্পেটিং মিল দুটি ভারতের রিগ্যাল গ্রুপকে ইজারা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হওয়ার আগে এ দুটি পাটকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ টনেরও বেশি। বর্তমানে সেখানে ১০ টনের মতো উৎপাদন হচ্ছে।

আরও